‘বিউটি সার্কাস’

Beauty cercus

মাহুমুদ দিদারের পরিচালনায় এবং জয়া আহসানের অভিনীত ‘বিউটি সার্কাস’। এই সিনেমার প্রতিটা ডায়লগ যেন খুব মন দিয়ে শুনতে হবে, কারণ এই সিনেমার প্রতিটা ডায়লগ যেন খুবই গুরুত্বপূর্ন। এই সিনেমার প্রতিটা দৃশ্যই যেন দেখার মতো।

‘সার্কাস’ গ্রিক থেকে ল্যাটিন হয়ে ইংরেজি ‘circus’ শব্দে পরিণত হয়েছে। আনুমানিক চৌদ্দ শতকে ইংরেজিতে এর ব্যবহার লক্ষ করা যায়। গ্রিক শব্দে এর অর্থ ‘রিং’। গোলাকারভাবে সার্কাসের প্যান্ডেল সাজানো হয়। এর প্রদর্শনের জন্য খোলামেলা উন্মুক্ত জায়গার দরকার পড়ে। গোলাকার জায়গাটিকে ‘রিং’ বলে আর এর তদারকির জন্য যারা থাকে তাদেরকে ‘রিংমাস্টার’ বলে। সার্কাসে যারা পারফর্ম করে তারা এক একজন জিমন্যাস্ট এবং পারফরম্যান্সের বিষয়গুলো জিমন্যাস্টিকসের অংশ। এগুলো প্রদর্শনের জন্য নানা খেলা দেখানো হয় যার মধ্যে দড়ি দিয়ে হেঁটে যাওয়া, রুমাল দিয়ে ভেলকি দেখানো, শারীরিক কসরত প্রদর্শন ইত্যাদি। নানা প্রাণিদেরকেও কাজে লাগানো হয় খেলা প্রদর্শনের জন্য। সার্কাসের শিল্পীরা নানা কৌশলে পারদর্শী হয় তারা এক একজন ‘ভাঁড়’ বা ক্লাউন হয়ে দর্শকের মনোরঞ্জন করে। বঙ্গদেশে ১৯০৫ সালে ‘দি লায়ন সার্কাস’ নামে প্রথম সার্কাস দল গঠিত হয়। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে জনপ্রিয় ছিল বগুড়ার মহাস্থানগড়ের ‘দি বুলবুল সার্কাস’, বরিশালের ‘দি রয়েল সার্কাস’, ফেনীর ‘দি সবুজ বাংলা সার্কাস’, সাতক্ষীরার ‘দি সুন্দরবন সার্কাস’, ঢাকার কেরানীগঞ্জের ‘দি সোনার বাংলা সার্কাস’। বর্তমানে চালু আছে ‘দি রাজমনি সার্কাস, দি গ্রেট রওশন সার্কাস’ সহ সরকার অনুমোদিত ২৫টি সার্কাসদল।

‘বিউটি সার্কাস’ ছবিতে ঐতিহাসিক সূত্রমতেই নামকরণ করা হয়েছে ‘দি বিউটি সার্কাস’। নারীকেন্দ্রিক নামে ছবির গল্প সার্কাসের পাশাপাশি নারীর গল্পও হয়ে উঠেছে।

ছবিতে সার্কাসের প্রদর্শনীগুলো ছিল অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। বিশাল প্যান্ডেলে শারীরিক কসরতের সাথে অন্যান্য খেলা প্রদর্শন করে দর্শকের মনোরঞ্জন দেখানো হয়েছে। সাধারণত জনগণকে দিয়ে অভিনয় করানো সহজ কাজ না কিন্তু এ ছবিতে সাধারণ জনগণের সার্কাসকেন্দ্রিক আবেগ, উচ্ছ্বাস ছিল স্বাভাবিক পর্যায়ের। ‘হৈ হৈ কান্ড রৈ রৈ ব্যাপার, জলেতে জিওল মাছ জমিনে সার্কাস’ এ জাতীয় প্রচারণার ভাষাগুলো চিত্তাকর্ষক ছিল নিঃসন্দেহে। সার্কাসের শিল্পীরা কেমন জীবনযাপন করে তার একটা চিত্রও আছে। তারা পালা করে বাংলা ছবি দেখে যা আমাদের নস্টালজিক করে দেবার মতো। ‘বিউটি সার্কাস’-এ দেখানো হচ্ছে সার্কাসে শিল্পীরা জনগণের মনোরঞ্জন শেষে নিজেরা টেলিভিশনে বাংলা ছবি দেখছে এবং জসিম-শাবানার ‘জিদ্দি’ ছবি দেখা গেছে টিভি পর্দায়। জয়া হুমায়ুন সাধুকে বলে-‘দেখ দেখ তোর পছন্দের নায়িকা।’

এটাও প্রমাণ করে তারা কোন ধরনের অভিনয়শিল্পীকে পছন্দ করত যেখানে শাবানাকে একজন সার্কাসশিল্পী আইডল মানে। এটা খুব ভালো ছিল।

জয়া আহসান প্রধান চরিত্রে ছবির। জয়া ‘বিউটি সার্কাস’-এ অগ্নিকন্যা। পর্দা কাঁপিয়ে দিয়েছে। একদিকে সার্কাস দেখিয়ে জীবিকা নির্বাহ অন্যদিকে সার্কাস টিকিয়ে রাখার জন্য সম্মুখ সমরে ঝাঁপ। ভাঙাগড়ার খেলায় একদম একশোতে একশো। দ্বিতীয় বলতে হয় রংলালের চরিত্রে এবিএম সুমনের কথা। জয়া আহসানের মতো একজন ক্লাস অভিনেত্রীর সাথে ন্যাচারালি অভিনয় করা অবশ্যই ভালো বিষয়। তার ক্যারিয়ারে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে ভালো চরিত্র এটাই হয়ে থাকবে অভিনয়ে, গেটআপে। তৌকীর আহমেদের চরিত্রটি মজার ছিল। নিজের অভিনয়ের পূর্ণ সক্ষমতা দেখিয়েছে গাজী রাকায়েত, তার চোখ যেন কথা বলে। শতাব্দী ওয়াদুদও তার সক্ষমতা দেখিয়েছে। ফেরদৌস নেগেটিভ রোলে ভালো ছিল। হুমায়ুন সাধু এখন একটা আবেগের নাম, যতটুকু স্পেস ছিল তার অভিনয়ে অসাধারণ।

গল্পের ভেতর আরেকটি গল্প আছে ‘বিউটি সার্কাস’-এ যা ছবিটির মাহাত্ম্য বাড়িয়েছে। ছবিটির গল্পে এ অংশটি গুরুত্ব রেখেছে বিশেষ করে সার্কাসকে যারা নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখে তাদের জন্য গল্পের এ অংশটা মেসেজ, এটা ভাবতে সাহায্য করবে সার্কাস দেখিয়ে ভালো কাজও করত এর সদস্যরা কিংবা তাদের জীবনেও ভালো কিছু গল্প থাকে।

ছবিতে গানের মধ্যে ‘নিরুদ্দেশ’ সেরা। এর বাণী, গায়কী মন ছুঁয়ে যায়। ‘বয়ে যাও নক্ষত্র’ ‘চিরকুট’ ব্যান্ডের সুমীর কণ্ঠে ভিন্নমাত্রা দেয়। লালন সঙ্গীত ‘ধন্য ধন্য বলি তারে’-র ব্যবহারও ভালো ছিল। ছবির সিনেমাটোগ্রাফি প্রশংসনীয়। ধুলোমাখা শট, বৃষ্টির শট, সার্কাসের বিশাল প্যান্ডেল রাউন্ড করে দেখানো কিংবা ট্রলি শটগুলো দৃষ্টিনন্দন।

মাহমুদ দিদার ছোটপর্দায় আলো ছড়ানো নির্মাতা ছিলেন এখন সিনেমার পর্দায়ও আলো ছড়াবেন যার প্রথম পদক্ষেপ ‘বিউটি সার্কাস’। শিল্পসম্মত কাজ করা যার নেশা তার সিনেমার পথ চলাও এমনই হবে এটা বলা যায়।

ইমেজঃ সংগৃহীত

মন্তব্য করুন